থানার অন্ধকার লকআপে বসে ছিল সজীব।
চোখ দুটো লাল, শরীর কাঁপছে।
লোহার গেটের ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার মা।
— সজীব… বাবা…
ছেলেটি মাথা নিচু করে রইলো।
— আমার দিকে একবার তাকাবি না?
সজীব ধীরে মুখ তুললো।
চোখে অপরাধবোধ আর ক্লান্তি।
— কেন এসেছো মা?
— ছেলে জেলে থাকলে মা না এসে পারে?
সজীব তিক্ত হেসে বললো—
— আমি তো তোমার ছেলে না মা…
আমি এখন “মাদক ব্যবসায়ী”।
মায়ের ঠোঁট কেঁপে উঠলো।
— তুই ছোটবেলায় বলতিস ডাক্তার হবি…
— স্বপ্ন বদলে গেছে।
— না বাবা…
স্বপ্ন বদলায়নি, মানুষগুলো বদলে দিয়েছে।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
লকআপের ভেতর থেকে অন্য আসামিদের শব্দ ভেসে আসছিল।
মা ধীরে বললেন—
— প্রথম কবে শুরু করলি?
সজীব দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
— বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে।
বন্ধুরা বলেছিল—
“টেনশন কমবে, মাথা ফ্রেশ হবে।”
— তারপর?
— তারপর আমি নিজেই শেষ হয়ে গেলাম।
প্রথমে নেশা কিনতাম…
পরে নেশা কেনার জন্য মানুষ ঠকাতাম…
শেষে নেশাই আমাকে বিক্রি করে দিলো।
মায়ের চোখ বেয়ে পানি পড়ছিল।
— তোর বাবার মৃত্যুর পর তোকে মানুষ করতে কত কষ্ট করেছি জানিস?
সজীব দেয়ালে মাথা ঠেকালো।
— জানি মা…
কিন্তু এই শহরে মাদক শুধু বোতলে না…
মানুষের হতাশায়ও মাদক আছে।
বেকারত্বে মাদক আছে।
একাকীত্বে মাদক আছে।
মা কাঁপা গলায় বললেন—
— তাই বলে নিজেকে ধ্বংস করে দিবি?
সজীব হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো—
— আমি একা ধ্বংস হইনি মা!
এই শহরে প্রতিদিন হাজার মানুষ নীরবে মরছে।
কারো হাতে ইয়াবা,
কারো হাতে সিরিঞ্জ,
কারো হাতে ক্ষমতা!
লকআপ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
মা ধীরে গেটের কাছে এগিয়ে এলেন।
— তুই কি বাঁচতে চাস?
সজীব চুপ।
— বল বাবা… বাঁচতে চাস?
কিছুক্ষণ পর সজীব ফুঁপিয়ে উঠলো।
— খুব বাঁচতে ইচ্ছে করে মা…
খুব।
মা লোহার ফাঁক দিয়ে তার হাত ধরলেন।
— তাহলে শুরু কর।
ধ্বংসের এই নীরব সাম্রাজ্য ভাঙতে হলে,
একজন মানুষকেই প্রথম “না” বলতে হয়।
সজীব কাঁদছিল।
বাইরে তখন ধীরে ধীরে ভোর হচ্ছিল।